Published : 09 May 2025, 02:59 AM
“পোপ দীর্ঘজীবী হোন”—সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার ব্যালকনি থেকে নতুন পোপের নাম ঘোষণার আগেই জনতা এই স্লোগানে মুখরিত করে তোলে পুরো স্কয়ার।
সেই স্লোগানের কেন্দ্রে ছিলেন রবার্ট প্রিভোস্ট, যিনি এখন থেকে ‘পোপ লিও চতুর্দশ’ হিসাবে পরিচিত হবেন।
৬৯ বছর বয়সী প্রিভোস্ট হলেন ক্যাথলিক চার্চের ২৬৭তম পোপ এবং প্রথম মার্কিন নাগরিক হিসেবে ইতিহাস গড়ে তিনি এই আসনে বসলেন।
পোপ লিও রবার্ট প্রিভোস্টকে একজন সংস্কারক হিসাবেই দেখা হয়। তিনি তার ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছেন পেরুর মিশনারি হিসাবে।
প্রথম আমেরিকান পোপ হলেন রবার্ট প্রিভোস্ট
সেখান থেকেই পরে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলে আজ তিনি পোপ হলেন। মাত্র এক বছর আগে ২০২৩ সালে তিনি কার্ডিনাল হন।
প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসই তাকে ওই বছর ভ্যাটিকানে নিয়ে এসেছিলেন। গণমাধ্যমে খুব কম সাক্ষাৎকার দেওয়ার কারণে বিশ্বমঞ্চে তার তেমন পরিচিতি নেই।
১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে জন্ম নেওয়া প্রিভোস্টের পরিবারে স্প্যানিশ ও ফ্র্যাঙ্কো-ইটালিয়ান বংশধারার ছাপ আছে।
বাল্যকালে তিনি গির্জার সেবক ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। এরপর ১৯৮৫ সালে পেরুতে যান অগাস্টিন গির্জার মিশনের অংশ হিসেবে।
দীর্ঘ সময় পেরুতে ধর্মপ্রচার চালানো এবং ল্যাটিন আমেরিকার গির্জায় তার ভূমিকার কারণে অনেকেই তাকে ‘ল্যাটিন আমেরিকান কার্ডিনাল’ হিসাবেও দেখেন।
পেরুতে ট্রুজিয়ো শহরে প্রিভোস্ট ১০ বছর স্থানীয় গির্জায় যাজক হিসেবে কাজ করেছেন এবং সেমিনারির শিক্ষক ছিলেন। গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোয় স্থানীয়দের মধ্যে তার স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল।
তার পেরুর নাগরিকত্ব আছে। প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস তাকে ২০২৩ সালে ভ্যাটিকানে নেওয়ার পর ‘পন্টিফিক্যাল কমিশন ফর ল্যাটিন আমেরিকা’র প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছিলেন। সেই থেকেই প্রিভোস্ট বিশিষ্ট একটি অবস্থানে উঠে আসেন।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আর্চবিশপ হন তিনি, আর এর কয়েক মাসের মধ্যেই কার্ডিনাল পদ পান। প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস ২০২৫ সালে প্রিভোস্টকে কার্ডিনালদের মধ্যে সবচেয়ে ঊর্ধ্বতন পদে বসিয়েছিলেন।
আর এবারের কনক্লেভে অংশ নেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ কার্ডিনালও ফ্রান্সিসই নিয়োগ করেছিলেন, তাই প্রিভোস্টের মতো একজন সংস্কারপন্থি পোপ নির্বাচিত হওয়াটা মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়, যদিও তিনি কার্ডিনাল হয়েছিলেন খুবই সাম্প্রতিক সময়ে।
তবে সবচেয়ে ঊর্ধ্বতন পদে থাকার কারণে প্রিভোস্ট কার্ডিনালদের মধ্যে ভালোভাবে পরিচিত ছিলেন। ক্যাথলিক চার্চে সংস্কারের ধারাবাহিকতা রক্ষায় পোপ ফ্রান্সিসের নীতি ও আদর্শকে সমর্থন করা একজন নেতা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে তাকে।
কারণ, প্রিভোস্ট অভিবাসন, গরিব জনগোষ্ঠী এবং পরিবেশের সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পোপ ফ্রান্সিসের মতো একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন বলেই মনে করা হয়।
কার্ডিনাল হিসাবে প্রিভোস্ট যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে চ্যালেঞ্জ জানানো থেকে বিরত থাকেননি। দুইজনেরই সমালোচনামূলক পোস্ট তিনি স্যোশাল মিডিয়া এক্সে শেয়ার করেছিলেন।
জেডি ভ্যান্সের কিছু মন্তব্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা গেছে প্রিভোস্টকে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক বাসিন্দাকে এল সালভাদরে ফেরত পাঠানো নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট তিনি এক্সে শেয়ার করেছিলেন।
একজন আমেরিকান হিসাবে প্রিভোস্ট যেমন ক্যাথলিক চার্চের ভেতরে বিভক্তির বিষয়ে সচেতন, তেমনি তার ল্যাতিন আমেরিকান ব্যাকগ্রাউন্ডও পোপ ফ্রান্সিসের ধারা বজায় রাখার প্রতিনিধিত্ব করে। পোপ ফ্রান্সিসও এসেছিলেন ল্যাটিন আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা থেকে।
প্রিভোস্ট নতুন ‘পোপ লিও চতুর্দশ’ হিসাবে তার ভাষণে বলেছেন, “আমাদের কানে এখনও বাজে পোপ ফ্রান্সিসের কণ্ঠস্বর। ঈশ্বরের সঙ্গে এক হয়ে, আসুন আমরা সবাই সামনে এগিয়ে যাই।”
প্রিভোস্ট অগাস্টিন সম্প্রদায়ের প্রথম সদস্য যিনি পোপ হলেন। ভ্যাটিকান বলছে, পোপ ফ্রান্সিসের পর প্রিভোস্টই আমেরিকা মহাদেশ থেকে নির্বাচিত দ্বিতীয় পোপ।
প্রিভোস্টের এক বন্ধু মার্ক ফ্রান্সিস বলেছেন, প্রিভোস্ট সবসময়ই বন্ধুবৎসল এবং উষ্ণ। তিনি রসিকও। তবে কখনও সবার মনোযোগের কেন্দ্রে (লাইমলাইট) আসার চেষ্টা করেন না। তার যত সমস্যাই থাকুক, তিনি রসিকতা করে যান এবং প্রফুল্লচিত্ত থাকেন।”